সোমবার | ১৫ জুলাই, ২০২৪
পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির অর্ধ বার্ষিক প্রতিবেদনে

পাহাড়ে ছয় মাসে ১০৭টি মানবধিকার লংঘনের ঘটনা ঘটেছে

প্রকাশঃ ০১ জুলাই, ২০২৪ ১০:৫৩:৫৮ | আপডেটঃ ১৪ জুলাই, ২০২৪ ১০:৪৯:৫২
সিএইচটি টুডে ডট কম, রাঙামাটি। চলতি বছরের জানুয়ারী থেকে জুন মাস পর্যন্ত  পাহাড়ে ১০৭টি মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা ঘটেছে।  এর মধ্যে ১২ জনকে হত্যা, ১১৭ জনকে গ্রেফতার, ১২ জনকে সাময়িক আটকসহ ৬৭টি গ্রামের অন্ততপক্ষে ৫ হাজার বম সম্প্রদায়ের নারী-পুরুষসহ ৫,৪৪৮ জন জুম্ম মানবাধিকার লংঘনের শিকার হয়েছেন। এছাড়া  অন্ততপক্ষে ১ হাজার বম পরিবারসহ ১ হাজার ২৮৪ পরিবার ও ৪৭টি বম গ্রামসহ ৭৬টি গ্রাম প্রত্যক্ষভাবে মানবাধিকার লংঘনের শিকার  ছাড়াও ১ হাজার ৮০৬ একর ভূমি বহিরাগত এনজিও, প্রভাবশালী ব্যক্তি দ্বারা বেদখল হয়েছে।

সোমবার  সন্তু লারমা নেতৃত্বাধী পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির(পিসিজেএসস) কেন্দ্রীয় সহ তথ্য ও প্রচার সম্পাদক সজীব চাকমার সই করা পার্বত্য চট্টগ্রামের মানবাধিকার পরিস্থিতির উপর অর্ধ-বার্ষিকী প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

প্রতিবদনে উল্লেখ করা হয়, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়িত না হওয়ায় পার্বত্য চট্টগ্রামের সামগ্রিক পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক ও বিস্ফোরণোন্মুখ। আওয়ামীলীগ সরকার একনাগাড়ে প্রায় ১৬ বছরের অধিক রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকলেও পার্বত্য চুক্তির অবাস্তবায়িত বিষয়গুলো বাস্তবায়নে এগিয়ে আসেনি। পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রেখেছে। পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে পার্বত্য সমস্যার রাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের পরিবর্তে সরকার বর্তমানে পূর্ববর্তী স্বৈরশাসকদের মতো ব্যাপক সামরিকায়ণ করে দমন-পীড়নের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের নীতি গ্রহণ করেছে। পার্বত্য চুক্তি মোতাবেক সংশোধন না করে সাম্প্রতিককালে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ী জুম্ম জনগণের ঐতিহাসিক, ঐতিহ্যগত, প্রথাগত ও বিশেষ অধিকারের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধিকে মৃত আইন ঘোষণা করা কিংবা বাতিল বা অকার্যকর আইনে পরিণত করার জোর ষড়যন্ত্র চলছে। জুম্ম বিদ্বেষী ও সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী কর্তৃক পূর্বের দুটি মামলার হাইকার্টের রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রীম কোর্টের আপীল বিভাগে এ ষড়যন্ত্রমূলক রিভিউ পিটিশন দায়ের করলেও খোদ বর্তমান সরকারের এ্যাটর্নি জেনারেল ষড়যন্ত্রকারীদের পক্ষ নেওয়ায় সেই ষড়যন্ত্র এখন বিপদজনক পর্যায়ে উপনীত করা হয়েছে। রিভিউ পিটিশন অনুসারে ২৭টি দফা বিলুপ্ত হলে শুধু পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি নয়, ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি এবং এর অধীনে প্রণীত পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন ২০০১, তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক আইনের বিধানাবলী ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তবে তার চেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে জুম্ম জনগণের ভূমি অধিকার এবং সামাজিক রীতি-প্রথা। এছাড়া চলতি বছরের ২৩ এপ্রিল রাঙামাটির আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট ফাতেমা বেগম মুক্তার নেতৃত্বে অপহৃত কল্পনার হদিস, অপরাধীদের গ্রেপ্তার ও শাস্তি এবং ভুক্তভোগী পরিবারের ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত না করেই মামলাটি খারিজের আদেশ দিয়েছেন। যা  দীর্ঘ ২৮ বছর ধরে মামলাটি চলার পর নি¤œ আদালতের এ আদেশ যেমন প্রশাসনকে অপহৃত কল্পনা চাকমার হদিস প্রদানের দায়িত্ব থেকে রেহাই ও কল্পনা চাকমা অপহরণকারীদের অপরাধ থেকে দায়মুক্তি দিয়েছে। ভুক্তভোগী কল্পনা ও তার পরিবারের মানবাধিকারকে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। যা পার্বত্য চট্টগ্রামে বিচারহীনতার এক চরম দৃষ্টান্ত স্থাপন।

প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়, গত ২ ও ৩ এপ্রিল সন্ত্রাসী গোষ্ঠী কুকি চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট(কেএনএফ) কর্তৃক বান্দরবানের রুমা ও থানচিতে ব্যাংক এবং রুমা থেকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ১৪টি আগ্নেয়াস্ত্র লুটের ঘটনায় যৌথবাহিনী কেএনএফের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের দোহাই দিয়ে নিরস্ত্র নিরীহ বম গ্রামবাসী নারী, শিশু, গর্ভবর্তী নারী নির্বিশেষে ধর-পাকড়, শারিরীক নির্যাতন, গ্রেফতার ও জেলে প্রেরণ, কেএনএফ তকমা দিয়ে ঠান্ডা মাথায় গুলি করে হত্যা ইত্যাদি চালিয়ে যাচ্ছে। গত ৭ এপ্রিল থেকে যৌথবাহিনীর কেএনএফ বিরোধী অভিযানে এযাবত গুলি করে হত্যা করা হয়েছে একজন শিশুসহ ১২ জন নিরীহ বম ব্যক্তিকে এবং গ্রেফতার করা হয়েছে গর্ভবতী নারী ও শিশুসহ ১১১ জন নিরীহ বম ও ত্রিপুরা গ্রামবাসীকে। অত্যাচারের ভয়ে ৪৭টি গ্রামের কমপক্ষে ১ হাজার পরিবারের(৫ হাজার জন) বম গ্রামবাসী গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র চলে গেলে তাদের মধ্যে দুই দফায় কমপক্ষে ১৯২ জন বম গ্রামবাসী প্রতিবেশী রাজ্যে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। এ নিয়ে এখন পর্যন্ত ভারতের মিজোরামে সরকারিভাবে তালিকাভুক্ত বম শরণার্থীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪৩৩ জন। যদিও বেসরকারি হিসেব মতে এ সংখ্যা দুই হাজারের অধিক বলে প্রতিবেদনে দাবী করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে দাবী করা হয়, চলতি বছরের জানুয়ারি  থেকে জুন পর্যন্ত সংঘটিত ১০৭টি ঘটনার মধ্যে ৭৩টি ঘটনা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী  ও সেটেলার ও ভূমিদস্যু দ্বারা ৪টি ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। এছাড়া  মিথ্যা মামলার শিকার হয়েছে ১৬ জন, জুম ও বাগান-বাগিচা চাষে বাধা ও ক্ষতি করা হয়েছে ৪২ পরিবারকে, সীমান্ত সংযোগ সড়কের কারণে ২৪২ পরিবার ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। এছাড়া ৪টি সহিংসতা ঘটনায় ৯ জন জুম্ম নারী ও শিশু মানবাধিকার লংঘনের শিকার হয়েছে।  পর্যটন কেন্দ্র স্থাপনের উদ্দেশ্যে সংরক্ষিত এলাকা বলে উল্লেখ করে দখল করা হচ্ছে। কাপ্তাই উপজেলার চিৎমরম ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের আজাছড়ি ভাঙামুড়া পাড়া এলাকায় কোন ক্ষতিপূরণ ছাড়াই দুই জুম্ম গ্রামবাসী উচ্ছেদের শিকার হয়েছে। ক্ষতিপূরণের দাবিতে এসব ক্ষতিগ্রস্তদের আন্দোলনের প্রেক্ষিতে একাধিকবার ক্ষতিপূরণের আশ্বাস দেওয়া হলেও ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়নি।


পাহাড়ের রাজনীতি |  আরও খবর
এইমাত্র পাওয়া
আর্কাইভ
সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত, ২০১৭-২০১৮।    Design & developed by: Ribeng IT Solutions