শুক্রবার | ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২১

খাগড়াছড়ির কমলছড়ি ইউনিয়নে সরকারি গৃহনির্মাণ প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম

প্রকাশঃ ২৮ জুলাই, ২০২১ ১০:০৪:০৫ | আপডেটঃ ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০৬:০৪:৩৬
সিএইচটি টুডে ডট কম, খাগড়াছড়ি। জেলার সদর উপজেলার কমলছড়ি ইউনিয়নের দুটি গ্রামে গৃহনির্মাণ প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। উপকারভোগীদের কাছ থেকে উৎকোচ গ্রহণ এবং নির্মাণ কাজে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের সত্যতাও মিলেছে অনুসন্ধানে। আর এসবের নেপথ্যে উঠে এসেছে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান সাউপ্রু মারমা ও সদস্য আবু তালেব এর নাম। এই দু’জনার অনিয়মে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা।

৫নং ওয়ার্ডের রাজশাহী টিলা এলাকায় দিনমজুর স্বামী মতিউর রহমানের সাথে পাঁচ সন্তান নিয়ে বাস করেন শাহিনুর বেগম (৩০)। ২য় পর্যায়ের দ্বিতীয় ধাপে প্রধানমন্ত্রীর দেয়া উপহারের ঘর পেতে তাকে গুনতে হয়েছে ৫০ হাজার টাকা। কমলছড়ি ইউপি চেয়ারম্যান সাউপ্রু মারমাকে দেয়ার নাম করে প্রায় ৭-৮ মাস আগেই ওই টাকা নিয়েছেন ইউপি সদস্য আবু তালেব। এতেও নিস্তার মেলেনি শাহিনুর বেগমের, ঘর বরাদ্দ আসার পর নির্মাণ কাজ শুরু হলে ফের ঘরের লিনটন বসানোর নামে তার কাছ থেকে ইট আর রডের জন্য অতিরিক্ত অর্থও আদায় করেছেন ওই ইউপি সদস্য। এছাড়া শাহিনুর বেগমের ঘর নির্মাণে ব্যবহার করা হয়েছে ২নং ও ৩নং মানের ইট।

কমলছড়ি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি ইদ্রিস আলী হাওলাদার বলেন, ‘ভুয়াছড়িতে বরাদ্দকৃত প্রায় সবকটি ঘরেই এমন অনিয়ম হয়েছে। কোনোটিরই সিসি ঢালাই দেয়া হয়নি, গাঁথুনিতেও করা হয়েছে অনিয়ম। এছাড়া নিম্মমানের ইট ও রড এর ব্যবহার এবং ফ্লোরেও করা হয়নি বালু ফিলিং। এতোসব অনিয়ম দেখে মেম্বার আবু তালেবের কাছে ইস্টিমেট দেখতে চাই, তবে এটি পাবলিককে দেখানো বারণ বলে এড়িয়ে গিয়েছেন তিনি।’

২নং ওয়ার্ডের মঙ্গলচাঁন কার্বারী পাড়ায় একটি কুঁড়েঘরে স্ত্রী ও চার সন্তান নিয়ে বসবাস করেন থোয়াইউ মারমা (৩৮)। স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই কাজ করেন অন্যের খেতে-খামারে। নুন আনতে পানতা ফুরানোর সংসার তাঁদের, তবুও খেয়ে না খেয়ে কিছু টাকা সঞ্চয় করেছিলেন দু’বছরে। ভেবে রেখেছিলেন এই বর্ষায় কুঁড়েঘরটি মেরামত করবেন এবং নতুন টিন লাগাবেন সেই টাকায়। তবে তা আর হয়ে ওঠেনি। মাস তিনেক আগে একদিন ইউপি চেয়ারম্যান সাউপ্রু মারমা আসেন থোয়াইউ মারমার বাড়িতে। এসে চেয়ারম্যান তাঁকে জানালেন ৫০ হাজার টাকা দিলে প্রধানমন্ত্রীর দেয়া উপহারের ঘর পাবেন তাঁরা। এই শুনে আর মুহূর্তও বিলম্ব করলেন না থোয়াইউ ও তাঁর স্ত্রী। স্বপ্নের ঘর পাওয়ার আশায় জমানো ১০ হাজার টাকা তাৎক্ষনিক চেয়ারম্যানের হাতে তুলে দিলেন ওই দম্পতি। বাকী ৪০ হাজার টাকা কিছুদিন পর দেওয়ায় কথা থাকলেও তা আর যোগাড় করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি তাঁদের। চেয়ারম্যানে চাহিদা পূরণে ব্যর্থতায় ভাগ্যে জোটেনি সেই স্বপ্নের ঘর। চেয়ারম্যানকে দেয়া সেই ১০ হাজার টাকাও এতোদিন ফেরত পাচ্ছিলো না তাঁরা। তবে গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে বিষয়টি জানানো হলে ওই ১০ হাজার টাকা থোয়াইউ মারমাকে ফেরত দিয়েছেন চেয়ারম্যান। টাকা ফেরত দেয়ার বিষয়টি গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে স্বীকারও করেছেন চেয়ারম্যান সাউপ্রু মারমা।      

এদিকে ওই এলাকার অন্য যারা সরকারি ঘর বরাদ্দ পেয়েছেন সেসব ঘর নির্মাণেও নানা অনিয়মের সত্যতা পাওয়া গেছে। মঙ্গলচাঁন কার্বারী পাড়ার উপকারভোগী শিমুলা ত্রিপুরা (২৫), ঊর্মিলা ত্রিপুরা (৪৫) ও শুভবালা ত্রিপুরা (২৬) জানান, তাদের সকলকে বলা হয়েছে তাদের ঘর নির্মাণের ব্যয় বাবদ সরকার ১ লাখ ৭০ টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। অথচ ২য় পর্যায়ের দ্বিতীয় ধাপে প্রতিটি ঘরের জন্য ১ লাখ ৯০ হাজার টাকা বরাদ্দ এসেছে বলে জানিয়েছেন প্রকল্পের সভাপতি ও খাগড়াছড়ি সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহফুজা মতিন।   

ঊর্মিলা ত্রিপুরা বলেন, ‘সরকারি বরাদ্দ নাকি কম, তাই আমার কাছে রড কেনার জন্য ২০ হাজার টাকা চেয়েছেন চেয়ারম্যান সাউপ্রু মারমা।’

শুভবালা ত্রিপুরা’র স্বামী অনিল ত্রিপুরা বলেন, ‘আমাদের বলা হয়েছে সরকারি বাজেট ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা। ভালোভাবে ঘর তৈরি করার জন্য ৩০ হাজার টাকা চেয়েছে চেয়ারম্যান।’

মঙ্গলচাঁন কার্বারী পাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, নির্মাণাধীন ঘরের মিস্ত্রী আইনুল ইসলামের কাছে ঘরের কোন নকশা কিংবা ইস্টিমেট নেই। যেনতেনভাবে চালিয়ে যাচ্ছেন নির্মাণ কাজ। কোথায় কতোটুকু নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার করতে হবে, পরিমাণ কতোটুকু এর কিছুই তাকে জানায়নি চেয়ারম্যান বা প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কোন কর্মকর্তা।

মিস্ত্রী আইনুল ইসলাম বলেন, ‘আমাকে নির্দিষ্টভাবে কোনোকিছু বলে দেয়া হয়নি। আমি চুক্তিভিক্তিক কাজ করছি। সুতরাং এসব আমার দেখার বা জানার বিষয়ও না।’

আমজাদ নামে এক ব্যক্তির দুই স্ত্রী। প্রথম স্ত্রী রাজিয়া বেগম থাকেন কমলছড়ি ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডের রাজশাহী টিলা এলাকায় এবং দ্বিতীয় স্ত্রী রেজিয়া বেগম থাকেন ৫নং ওয়ার্ডের ওয়াজেদ টিলা এলাকায়। কাকতালীয়ভাবে তার দুই স্ত্রীর নামেই ২য় পর্যায়ের দ্বিতীয় ধাপে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ভূমিসহ ঘর। এছাড়া আইয়ুব আলী নামে এক ব্যবসায়ী থাকেন খাগড়াছড়ি সদরে। অথচ তিনিও ভুয়াছড়ি এলাকায় বরাদ্দ পেয়েছেন এই প্রকল্পের ভূমি ও ঘর। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আইয়ুব আলীর মালিকানায় একটি ট্রাক্টরও রয়েছে। তিনি খাগড়াছড়ি ট্রাক্টর মালিক সমিতির সদস্য এবং স্বচ্ছল।
যাবতীয় অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন চেয়ারম্যান সাউপ্রু মারমা ও ইউপি সদস্য আবু তালেব। তাঁদের দাবী এটি নিছক ষড়যন্ত্র।

কমলছড়ি ইউপির ২নং ওয়ার্ডের মেম্বার ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি সুইনু মারমা বলেন, ‘একের পর এক অনিয়ম করে চলেছে চেয়ারম্যান সাউপ্রু মারমা। অথচ এসব দেখার যেনো কেউই নেই। সবশেষ প্রধানমন্ত্রীর দেয়া উপহারের ঘরেও ব্যাপক অনিয়ম করেছেন তিনি। এতে সরকারের ইমেজ দারুণভাবে ক্ষুণ্ণ করবে।’

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা এবং প্রকল্পের উপজেলা কমিটির সদস্য সচিব কাজী মাসুদুর রহমান বলেছেন, প্রকল্পের শর্ত লঙ্ঘন করে কোন জনপ্রতিনিধি যদি তালিকা প্রণয়নে এবং বরাদ্দকৃত বাড়ি নির্মাণে কোন প্রকার অনৈতিকতা এবং অনিয়মের আশ্রয় নিলে তার দায়-দায়িত্ব অবশ্যই তাঁদেরকে বহন করতে হবে।

প্রকল্পের সভাপতি ও খাগড়াছড়ি সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহফুজা মতিন বলেন, ‘অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সত্যতা পাওয়া গেলে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে।’


খাগড়াছড়ি |  আরও খবর
এইমাত্র পাওয়া
আর্কাইভ
সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত, ২০১৭-২০১৮।    Design & developed by: Ribeng IT Solutions