পার্বত্য চট্টগ্রাম: মৃত্যুর মিছিল শেষ হবে একদিন ! -প্রদীপ চৌধুরী

প্রকাশঃ ১২ অগাস্ট, ২০১৯ ০৯:৪৪:১৮ | আপডেটঃ ০৮ ডিসেম্বর, ২০১৯ ১০:১৪:০৮
গত রোববার মধ্য রাতে রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলা সদরের বাবুপাড়ায় প্রতিপক্ষ সশস্ত্র দুর্বৃত্তদের গুলিতে দু’দুটো তরুণের প্রাণ অকালে ঝরে গেছে। প্রায় প্রতিনিয়তই পাহাড়ে অবৈধ অস্ত্রের ছোঁড়া বারুদের উত্তাপে মানুষের জীবন বিপন্ন হচ্ছে। চাঁদাবাজি আর সন্ত্রাসে অতিষ্ঠ জনজীবন। তারই ধারাবাহিকতায় মৃত্যু’র মিছিলে যোগ হলো আরও দুটি প্রাণ আরও দুটি নাম। শতসিদ্ধি চাকমা ও এনো চাকমা। এই তালিকা দিনকে দিন দীর্ঘ হতে চলেছে।

এই ঘটনায় তীব্র মনোকষ্ট থেকে তাঁদের রাজনৈতিক সহকর্মী জুপিটার চাকমা ফেইসবুকে একটি আবেগঘন স্ট্যাটাস দিয়েছেন। জুপিটার চাকমা ঘটনাস্থল বাবুপাড়ার বাসিন্দা এবং নিশ্চয় নিহতদের দীর্ঘ পরিচিত হতে পারেন। দৈনিক সমকাল পত্রিকায় সাবেক সহকর্মী এবং আমার ফেইসবুক বন্ধু হওয়ায় জুপিটারের পোস্টটি তুলে ধরলাম প্রাসঙ্গিক কারণেই।

তিনি লিখেছেন-
‘তোর মা হলো ছেলে হারা
তোর ছেলে হলো বাবা হারা
তোর স্ত্রী হলো স্বামী হারা
তুমি আর নেই, তা বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে।

কষ্ট হওয়ার-ই কথা। রাস্তায় একটি বেওয়ারিশ কুকুর অকালে প্রাণ হারালেও আমাদের প্রত্যেকের মনে একটু হলেও বেদনার রেখাপাত করে। সেক্ষেত্রে দু’দুটো তরুণের প্রাণ অকালে দুর্বৃত্তের গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে গেলে নিশ্চয়ই স্বজন-সহকর্মীদের মন তো ভারী হয়ে উঠবেই। শতসিদ্ধি চাকমা ও এনো চাকমা, আমার কোন স্বজন নন। নিহত শতসিদ্ধি, এনো এবং সাবেক সহকর্মী জুপিটারদের রাজনৈতিক মতাদর্শ ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে পছন্দের নয়। একইভাবে অন্যসব অস্ত্রনির্ভর রাজনৈতিক পক্ষগুলোর তৎপরতাও অগ্রহণযোগ্য। কিন্তু ধর্মীয় বিশ^াসে জেনেছি, শত্রু’র মৃত্যু কামনাও অমানবিক। মানুষ মাত্রই কারো কোন অকাল মৃত্যু আমরা কামনা করতে পারি না। আর যাঁরা মানুষ হয়ে এমন হন্তারক-জানোয়ার হয়ে উঠছেন, তারা কারা? হয়তো বা গভীর অনুসন্ধানে বেড়িয়ে আসবে খুনিরা ‘শতসিদ্ধি এবং এনো’-দেরই পরিচিত। খুনিরা বেড়ে উঠছেন খুনের শিকার হওয়া মানুষের মধ্যেই। তাদের সবাই চিনলেও জীবনের ভয়ে কেউ মুখ খুলছেন না। এরকম একটি হন্তারক সমাজ, এই সভ্য সময়ে কী ভাবা যায়?

রাজনীতির নামে পার্বত্য চট্টগ্রামের এই অসহনীয় দুরাবস্থা থেকে কখন মুক্তি মিলবে, তা একমাত্র জানবে যাঁরা মারছেন আর যাঁরা মরছেন, এই দুই পক্ষের কর্তাব্যক্তিরাই। নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি’র ফেনা তুলে এভাবে মানুষ হত্যা-চাঁদাবাজি-অপহরণ আর জোরজুলুম কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। সভ্য সমাজে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামোর ভেতর এই ধরনের পৈশাচিক ধৃষ্টতা অনেকটা প্রচলিত আইন ও বিচারকে চ্যালেঞ্জ করারই নামান্তর। কোন যুক্তিতে এই ধরনের অপতৎপরতাকে রাজনীতি বলা যাবে? আর রাজনীতিই যদি হয়ে থাকে, তাহলে এটিকে কী নামে অভিহিত করবেন খুনোখুনির সাথে জড়িত পক্ষগুলো?
চরম অন্যায্যভাবে মানুষকে জিম্মি করে মৌলিক অধিকার হরণ, মানুষের চোখে ধুলো দিয়ে লুঠপাট এবং মানুষের জীবন কেড়ে নেয়া জনবিচ্ছিন্নতার সংস্কৃতি। জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা বলে জনগণের ওপর অস্ত্রবাজি চাপিয়ে দেয়ার পরিণাম কখনোই সুখকর হয় না। নিকট অতীতে এ ধরনের নিপীড়ক নেতাগিরির ফলাফল কেমন হয়েছে, সেটা সবারই ভালো জানা আছে।

চুক্তি’র পক্ষ-বিপক্ষ, পূর্নস্বায়ত্তশাসন-গণতন্ত্রী নামে চারভাগে বিভক্ত কথিত এই অপ-রাজনীতির দায়ভার কখনো জনগণ নেবে না। কারণ, জনগণ যে ভালোবাসা আপনাদের দেখিয়েছে অথবা দেখাতে বাধ্য হচ্ছেন, তা এক কথায় জোরজবরদস্তিমুলক। খেটে খাওয়া জুমচাষী, পরিবহন শ্রমিক, সামান্য সরকারি-বেসরকারি চাকুরিজীবি, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, মাঝিমাল্লা কেউ তো রেহাই পাচ্ছেন না চাঁদাবাজির খড়গ থেকে। সুনির্দিষ্ট কোন পেশা কিংবা দৃশ্যমান কোন জীবিকায় না থেকেও ‘বাবু’দের আলিশান জীবনযাপন সাধারণ জনগণের কাছে এখন বীতশ্রদ্ধার বিষয়। সমাজে অরাজক-অস্থিরতা সৃষ্টি করে কখনোই কোন সমাধান মেলেনি। সরকার-প্রশাসনকে বোকা বানিয়ে বিব্রত করে কোনই কাঙ্খিত ফল আসবে না। কোন কোন সময় চাঁদাবাজির অসীম যন্ত্রণায় সাম্প্রদায়িকতাও ঝেঁকে বসে। আপনাদের বিভক্তি অপকর্মে হয়রানির শিকার হতে বাধ্য হন সাধারণ মানুষরাই।
বৃহৎ প্রতিবেশি ভারতের দিকে চোখ ফেরালে পার্বত্য চট্টগ্রামের সীমান্ত সংলগ্ন ‘ত্রিপুরা’র চিত্র ভেসে উঠবে। বৃহৎ ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মতামতকে উপেক্ষা করে স্বাধীনতাকামী সংগঠনগুলো স্বাধীনতা তো দূরে থাক, অনেকে জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেননি। উপরন্তু, জনগণের ওপর অস্ত্রের রাজনীতি চাপিয়ে দিয়ে নিজেরাই হয়েছেন বহুধাবিভক্ত। আজকের ত্রিপুরা’র রাজনৈতিক পরিস্থিতি’র সাথে পার্বত্য চট্টগ্রামের সবকটি কথিত আঞ্চলিক দলের নেতারা নিবিড়ভাবে পরিচিত। তাছাড়া এখনো যাঁরা পাহাড়ের (বিশেষ করে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি) বর্ষীয়ান রাজনীতিক আছেন, তাঁদের অনেকের গেরিলা জীবনের সূতিকাগার ত্রিপুরা রাজ্যের অরণ্যই। তাঁদের উদ্দেশ্যে জ্ঞান বিলানো আমার লক্ষ নয়। কিন্তু নিজেদের খুনোখুনির দায় যখন কোন সরকারের ঘাঁড়ে চাপানো হয় তখন বিষয়টি অনেকটা ‘উধোর পিন্ডি বুধোর ঘাঁড়ে’ চাপানোর মতোই ঠেকে। গত ৯ আগস্ট একটি বিশেষ দিবসের স্বীকৃতির উছিলায় রাঙামাটি এবং ঢাকায় অনুষ্ঠিত বেশ কটি সমাবেশ থেকে এই ধরনের তৎপরতার ইঙ্গিত মেলে।

দোষারোপের সংস্কৃতি থেকে বেড়িয়ে আয়নার সামনে দাঁড়ালে আমরা প্রত্যেকে নিজের ভুলভ্রান্তিগুলো দেখতে পাই। ১৯৯৭ সালের ডিসেম্বরে পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি’ স্বাক্ষর করেছিলেন বর্তমান সরকার প্রধান বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা ও জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় নারায়ণ লারমা প্রকাশ সন্তু লারমা। শেখ হাসিনা সরকার ‘১৯৯৬-২০০১’ মেয়াদকালেই পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার সমাধানে অনেকদূর এগিয়ে গিয়েছিল। দেশের সেসময়কার রাজনৈতিক বাস্তবতায় হয়তো চুড়ান্ত লক্ষে পৌঁছানো যায়নি। যেকোন চুক্তি বা সমঝোতায় পৌঁছাতে দুই পক্ষের সহিষ্ণুতা খুবই জরুরী। চুক্তি’র পরের দুই দশকে কখনো চুক্তি বাস্তবায়ন, কখনো পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন, কখনো সংস্কার আবার কখনো গণতন্ত্রী’র নামে জনগণের ওপর নেমে এসেছে খুন-চাঁদাবাজি-অপহরণ-সন্ত্রাস আর নৈরাজ্য। যতো নামেই কথিত আঞ্চলিক রাজনৈতিক শক্তি’র আত্মপ্রকাশ ঘটেছে, প্রতিটি নীতি আদর্শের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল সশস্ত্র অপতৎপরতা। এই অপতৎপরতার দায় কোন সরকারের ওপর বর্তাতে পারে না। দেশ স্বাধীনের পর সর্বহারা-গণবাহিনী থেকে সর্বশেষ চরমপন্থী পর্যন্ত সমতলে যেসব সশস্ত্র তৎপরতা চলেছে তা তো ‘লাল বই’-এর রক্তাক্ত উৎপাত। সেই উৎপাত সরকারকে জনগণের চাপে কাঁধে তুলে নিতে হয়েছে। সশস্ত্র তৎপরতাকে সশস্ত্রভাবে নির্মূল করা হয়েছে।

পাহাড়েও এমন দিন আসতে পারে যখন জনগণের চাপে সরকার বাধ্য হবে এবং সবকিছুর শেষ হবে একদিন।

প্রদীপ চৌধুরী: পাহাড়ের সংবাদকর্মী