পাহাড়ের পর্যটন নিয়ে আশা-হতাশার কথা ও পরিবেশ বান্ধব বিনিয়োগ : প্রান্ত রনি

প্রকাশঃ ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৩ ০৪:২৭:৩৫ | আপডেটঃ ২১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৪ ০৮:০২:৩৭
আজ থেকে ঠিক ছয় বছর আগে; ২০১৭ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর বিশ্ব পর্যটন দিবসের এক অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের দেওয়া এক প্রেস ব্রিফিংয়ে রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের তৎকালীন চেয়ারম্যান বৃষকেতু চাকমা বলেছিলেন রাঙ্গামাটির পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে ১২শ’ কোটি টাকার একটি মেগা প্রকল্প আসছে। সেই সময়ে গণমাধ্যমে এই সুখবরটা খুব চাউর হয়েছিলো। মানসিকভাবে স্বস্তি পেয়েছিলেন রাঙ্গামাটি জেলার পর্যটন খাতসংশ্লিষ্টরা। ছয় বছর আগের আশার বাণীতে খুশি হলেও এখন রীতিমতো হতাশ হচ্ছেন এই খাতে জড়িতরা। বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্টদের দেয়া ভাষ্যে সেই চিত্রই আমরা দেখেছি।

পার্বত্য চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি অনুযায়ী স্থানীয় পর্যটন শিল্প পার্বত্য জেলা পরিষদসমূহের হস্তান্তরিত বিভাগ। কিন্তু এই হস্তান্তরিত বিভাগ পর্যটন শিল্পের জন্য কতটুকু হস্তক্ষেপ করেছে বা এ নিয়ে কি ভেবেছে জেলা পরিষদগুলো তা সত্যিই ভাবনার বিষয়। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ সূত্রে জানতে পেরেছি, বিগত কয়েক বছরে রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ, পরিষদের মোট বাজেটের এক শতাংশ পর্যটন খাতের জন্য বরাদ্দ রাখলেও খরচ করেছে শূন্য টাকা। তার মানে বিষয়টি কী দাঁড়ালো গৎবাঁধা বাজেট রেখেও পর্যটনে উন্নয়নে নজর নেই এই প্রতিষ্ঠানটির?

আজ সেই ২৭ সেপ্টেম্বর, বিশ্ব পর্যটন দিবস আবারও ফিরে এসেছে। ঢাকা শহরেও হয়েছে পর্যটন মেলার আয়োজন। কক্সবাজারেও হচ্ছে বিচ কার্নিভাল; জেলার পর্যটন সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন এবারের পর্যটন দিবস ঘিরে কক্সনবাজারে ১০ লাখ পর্যটকের সমাগম হবে। রাঙ্গামাটিতেও হয়ে গেলো একটা র‌্যালি আর আলোচনা সভা। অন্যান্য বছরের মতো এবারও সেই র‌্যালি আর আলোচনা সভা হয়েছে রাঙ্গামাটিতে। যেনো পর্যটন দিবসের প্রাসঙ্গিকতা র‌্যালি আর আলোচনাতেই সীমাবদ্ধ; তবে এবার যেন একটু বাড়তি আয়োজন দিয়েছে ‘পর্যটন মেলা’। অথচ রাঙ্গামাটি শহরজুড়ে প্রায় অর্ধশতাশিক হোটেল-মোটেল। রয়েছে ট্যুরিস্ট বোট সমিতি থেকে শুরু করে কটেজ-রিসোর্ট মালিক সমিতি। কিন্তু পর্যটকদের জন্য এইদিনে কোন সুবিধা কিংবা কি প্রণোদনা বা ডিসকাউন্ট দিয়েছে তারা? পর্যটন করপোরেশনের মোটেলে একদিনের জন্য ২৭ শতাংশ ছাড় দেওয়া হলেও অন্য কোনো খাতই নিয়ে এগিয়ে আসেনি!

আবার আসি পরিবেশ নিয়ে কিঞ্চিত আলোচনায়। পরিবেশের সঙ্গে ভারসাম্য রেখে পরিবেশবান্ধব পর্যটন গড়ার লক্ষ্য নিয়েই এবারের পর্যটন দিবসের প্রতিপাদ্য করা হয়েছে- ‘পর্যটনে পরিবেশবান্ধব বিনিয়োগ’। এই শুভ বার্তায় যেন খাত সংশ্লিষ্টদের প্রতি নজর দেন এই প্রত্যাশা আমাদের। বিগত এক বছরে রাঙ্গামাটির পর্যটন শিল্পে উন্নয়নে হয়েছে এটা সত্য। কিন্তু এটি কি যথাযথ কিংবা মানসম্মত? বিগত দুই-তিন বছরে রাঙ্গামাটির কাপ্তাই হ্রদকে পুঁজি করে তৈরি হয়েছে অসংখ্য ভাসমান হাউজবোট। এইসব বোট কাপ্তাই হ্রদে পর্যটকদের নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এই উদ্যোগ রাঙ্গামাটির পর্যটন সেক্টরের নয়া দিগন্ত হলেও কাপ্তাই হ্রদকে ভিত্তি করে গড়ে তোলা এসব হাউজবোট হ্রদের পরিবেশ-প্রতিবেশ রক্ষায় কতটুকু নেতিবাচক-ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে সেটিও দেখার বিষয়। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম কৃত্রিম জলাধার বলা হয়ে থাকে রাঙ্গামাটির কাপ্তাই হ্রদ। এই হ্রদের পানির মান ক্রমান্বয়ে কমছে। হ্রদ পাড়ে শহুরাঞ্চলের মানুষের বসতির কারণে প্রায় বেশিরভাগই বাসা-বাড়ির শৌচাগারের মলের পানি মিশে যায় কাপ্তাই হ্রদেই। আবার লঞ্চ, ট্যুরিস্ট বোটের পর এবার হাউজ বোটের মল ব্যবস্থাপনার শেষ গন্তব্যও যেন কাপ্তাই হ্রদই। এছাড়া পর্যটক ও স্থানীয়দের ফেলনা পলিথিন ও ময়লা আবর্জনা তো ফেলা হচ্ছেই। পর্যটন নিয়ে আশার এসব কর্মযজ্ঞ আর স্থানীয়দের দখল দূষন যেন কাপ্তাই হ্রদকে মেরে না ফেলে এদিকেও ভাবা দরকার। তাই এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় খুবই প্রাসঙ্গিক এবং এর দিকে নজর দেয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

বিগত কয়েক বছরে রাঙ্গামাটি পর্যটনের যে বিকাশ ঘটেছে সেটির বেশিরভাগই হয়েছে রেষ্টুরেন্ট নির্ভর। সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নিজেরা পার্ক বা কৃত্রিম বিনোদনকেন্দ্র বানিয়ে টিকেট বিক্রয় করে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা করছে আর স্থানীয় উদ্যোক্তা গড়ে তুলছেন রেষ্টুরেন্ট। স্থানীয় উদ্যোক্তারা বিগত দিনে এই খাতে যে আলো জ্বালিয়েছেন তার পুরোটাই ছিল রেষ্টুরেন্টকেন্দ্রিক। গাঙ সাবারাং, বার্গী লেকভ্যালি, বেরাইন্যা, ইজোর রেষ্টুরেন্ট, বড়গাঙসহ অসংখ্য বিনোদনকেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাই মূলত রেষ্টুরেন্টকে কেন্দ্র করে। যদিও কয়েকটি পরবর্তীতে গড়ে তোলা হয়েছে কটেজ-রিসোর্ট ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধার। এক্ষেত্রে স্থানীয় উদ্যোক্তার হতাশার কথা তো আছেই। অনেকেই পুঁজি সংকটের কারণে প্রথমেই এই রেষ্টুরেন্ট নিয়ে শুরু করছেন পর্যটন সংশ্লিষ্ট উদ্যোগ। এক্ষেত্রে সহজে ব্যাংক ঋণপ্রাপ্তি ও সরকারি সহায়তার অপ্রতুলতা তো আছেই। এই দিকে নজর দেয়া খুবই জরুরি।

এবার আসি সাজেকের আলোচনায়। এক সময়ে মেঘ উপত্যকা সাজেক ভ্যালি দেশের মানুষের কাছে পর্যটন শিল্পের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ও নান্দনিক এলাকা হিসেবে পরিচিত পেলেও এখন সাজেক ফেরত অনেক পর্যটকই বলছেন নিরাশার কথা। কারণ হিসাবে তারা বলছেন অপরিকল্পিত নির্মাণ ও পরিবেশবান্ধবভাবে অবকাঠামো গড়ে না ওঠার কারণে সাজেকের প্রতিবেশ দিনদিন ঘিঞ্জি হয়ে যাচ্ছে। সাজেকের কংলাক ও রুইলুই পাহাড়েই গড়ে উঠেছে প্রায় শতাধিক রিসোর্ট-কটেজ। সাজেকের মতো এই পর্যটন পরিবেশ যেন রাঙ্গামাটি শহরের গড়ে না ওঠে সেই বিষয়ে এখনই ভাবা দরকার। রাঙ্গামাটির আসামবস্তি-কাপ্তাই ১৮ কিলোমিটার সংযোগ সড়কটি একটি নান্দনিক সড়ক। বিগত সময়ে এটি একটি লেনের একটি সড়ক হলেও সাম্প্রতিকসময়ে এটিকে দুই লেনের সড়ক করা হয়েছে। এই সড়কের এক পাশেই বিশালাকার কাপ্তাই হ্রদ ও আরেক বিস্তীর্ণ সবুজ পাহাড়। এই সড়কটি নিয়ে পর্যটনে আশা ও স্বপ্ন দেখছেন এখানকার খাত সংশ্লিষ্টরা। রাঙ্গামাটি শহরকেন্দ্রিক যে পর্যটন কার্যক্রম গড়ে উঠেছে বিগত দিনে তার বেশিরভাগই এই সড়কটি ঘিরে। যে কারণে সড়কের পাশেই অবকাঠামো নির্মাণ বাড়ছে ক্রমান্বয়ে। কিন্তু এটি যেন পরিবেশবান্ধব ও পরিকল্পিত হয় সেদিকে নজর দিকে হবে। যেন আরেক সাজেক উপত্যকার মতো সড়কের দুই পাশে রিসোর্ট-কটেজের সমারোহ না ঘটে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি জেলা হলো রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান। স্থানীয়রা ও বেশিরভাগ পর্যটকদের কাছে পাহাড়ের তিন জেলার পর্যটন বৈচিত্র্যতার কথা জানতে চাইলে সবচেয়ে হতাশার কথা শোনান রাঙ্গামাটিতে ঘিরেই। বাস্তব দিক থেকেই রাঙ্গামাটি পিছিয়ে পড়েছে। রাঙ্গামাটির সাজেক ভ্যালি ভৌগোলিক দিক থেকে রাঙ্গামাটির হলেও এই উপত্যকার পর্যটনকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক প্রভাব পড়ে পুরোটাই খাগড়াছড়িতে। সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে বান্দরবান-খাগড়াছড়ি পর্যটকদের ঘুরে বেড়ানোর ক্ষেত্রে অনেক সহজলভ্য। যদিও বিগত দিনে বান্দরবানে কেএনএফের অপতৎপরতার কারণে এই জেলার পর্যটনে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে যদিও সেটি দীর্ঘমেয়াদি ভাবে প্রভাব ফেলার সম্ভাবনা নেই। রাঙ্গামাটির পর্যটনে সবচেয়ে বড় ভ‚মিকা রেখে আসছে কাপ্তাই হ্রদ। তাই এই হ্রদকে নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ও পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ জরুরি। কেবল পর্যটন আর অর্থ আয়ের চিন্তা মাথায় থাকলেও হ্রদ ও পাহাড়ের জীববৈচিত্র হারিয়ে যাবে। পাহাড় বা পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটনকে এগিয়ে নিতে পাহাড়, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর চাহিদা ও তাদের সংম্পৃক্ত রেখেই এগিয়ে যেতে হবে। পাহাড়তে বিপন্ন করে, পরিবেশ-প্রতিবেশকে ধ্বংস করে পর্যটন নিয়ে এগুনোর ভাবনা হবে আত্মঘাতী ও পরিবেশবিমুখী।

লেখক: সাংবাদিক ও আলোকচিত্রী