শনিবার | ১৯ অক্টোবর, ২০১৯
রাঙামাটিতে পাহাড় ধসের ২ বছর

ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক মেরামতে গাছের খুঁটি দিয়ে পাইলিং, অর্থ অপচয়ের অভিযোগ

প্রকাশঃ ১৭ জুনe, ২০১৯ ০৫:৩৭:২৭ | আপডেটঃ ১৯ অক্টোবর, ২০১৯ ০১:৫৯:৪৮
সিএইচটি টুডে ডট কম, রাঙামাটি। ২০১৭ সনের ১৩জুন পাহাড় ধব্বসে ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক মেরামতে আবারো গাছের বল্লী দিয়ে পাইলিং করা হচ্ছে, পাহাড় ধব্বসের পর জরুরী ভিত্তিতে সড়ক সচল করতে ব্যয় করা হয় ১৬ কোটি টাকা, স্থায়ী রক্ষাপদ কাজ করার কথা থাকলেও  এবার আবারো ২ কোটি টাকা ব্যয়ে গাছের খুটি দিয়ে বল্লী গেড়ে পাইলিং করা হচ্ছে। এতে বর্ষায় জনগনের আতংক যেমন কাটছে না, তেমনি সরকারের লাখ লাখ টাকা ঢুকছে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের পকেটে।

তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৭ সালের ১৩ জুনের পাহাড় ধসের দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলো তাৎক্ষণিক সাময়িক মেরামত কাজ করা হয়েছিল গাছের খুঁটির পাইলিং দিয়ে আর মাটির বস্তা ভরাট করে। এরই মধ্যে ধসে গেছে ওইসব পাইলিং। ফলে আবার বেহাল দশায় ঝুঁকিতে সড়কগুলো। তৈরি হয়েছে, এসব সড়ক যে কোনো ভেঙে ধসে যাওয়ার আশঙ্কা। আবার শুরু হয়েছে বর্ষা। এ অবস্থায় সড়ক ও জনপথ বিভাগ বিভিন্ন আভ্যন্তরীন সড়ক মেরামত ও পাহাড় ধবসে ক্ষতিগ্রস্ত সড়কে মেরামত করতে ৬ কোটি ৩০ লাখ টাকার আবারও অস্থায়ী মেরামত কাজ করা হচ্ছে। শুধু গাছের খুঁিট দিয়ে ঝুকিপূর্ণ সড়কগুলো সাময়িক মেরামত কাজে দুই কোটি খরচ করছে, রাঙামাটি সড়ক ও জনপথ বিভাগ।   

তথ্যসূত্র মতে, ওই দুর্যোগের পর এসব ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের কেবল সাময়িক সংস্কার কাজে ব্যয় হয়েছে প্রায় তিন কোটি টাকা। তখনও বেশিরভাগ স্থানে গাছের খুঁটি দিয়ে করা হয়েছে পাইলিং কাজ। এ ছাড়া রাঙ্গামাটি-চট্টগ্রাম সড়কের সাপছড়ির শালবনে নির্মিত অস্থায়ী বেইলি সেতুতে ব্যয় হয়েছে প্রায় আড়াই কোটি টাকা। অনেকের মন্তব্য, ওইসব টাকা ব্যয় করা হয়েছে অযথা। ওইসব কাজে সড়কগুলোর কোনটার স্থায়িত্ব হতে পারেনি। এরপরও আবার অযথা দুই কোটি টাকা খরচ করে গাছের খুঁটি গেড়ে সড়কগুলোর মেরামত কাজ করছে সরকারের রাঙামাটি সড়ক ও জনপথ বিভাগ। এতে রয়েছে নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ। এসব কাজে দুই কোটি টাকা বরাদ্দের ছাড় করা হলেও অর্ধেক টাকা খরচ করা হবে না। দুই কোটি টাকার কাজ দেয়া হয়েছে, ক্ষমতাসীন দলের ঠিকাদারকে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দুটি হল- ইউনুস অ্যান্ড ব্রাদার্স ও এস অনন্ত ট্রেডার্স এর নামে এসব পাইলিং কাজ করা হচ্ছে রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়কের আট স্থানে। কাজ ভাগ করে দেয়া হয়েছে ১০ গ্রুপে।

তবে সরজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত অনেক সড়কে নামে মাত্র গাছের বল্লী দিয়ে পাইলিং করা হচ্ছে, সড়ক ও জনপথের নির্বাহী প্রকৌশলীসহ কর্মকর্তা সংকটের সুযোগ নিচ্ছে অনেক ঠিকাদার।  

রাঙামাটি সড়ক ও জনপথ বিভাগের তথ্যমতে, ওই পাহাড় ধসের ঘটনায় রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়কের ৩১ স্থানে বড় ধরনের ভাঙন ও গর্তের সৃষ্টি হয়। এছাড়াও শহরের মধ্যে ৮ স্থানে ভাঙন ও গর্ত হয়েছে। মূল শহরসহ গোটা রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়কে ভাঙন ও গর্ত হয়েছে মোট ৩৯ স্থানে। সেগুলোর সাময়িক মেরামত কাজ করা হয়েছে গাছের খুঁটি গেড়ে পাইলিং দিয়ে। যেখানে ব্যয় হয়েছে ২ কোটি ৮২ লাখ টাকা। কেবল রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়কের ৩১ স্থানে ভাঙন মেরামত কাজে গাছের খুঁটি দিয়ে পাইলিং ও মাটি ভরাট করতে ব্যয় হয়েছে ২ কোটি ৩১ লাখ টাকা। আর শহরের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত ৮ স্থানে ভাঙন মেরামত কাজে ব্যয় হয়েছে ৫১ লাখ টাকা। এছাড়াও বিলীন হওয়ায় রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়কের সাপছড়ির শালবনে অস্থায়ীভাবে যান চলাচলের জন্য নির্মিত হয়েছে একটি অস্থায়ী বেইলি সেতু। সেখানে ব্যয় হয়েছে ২ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। অনেকের মন্তব্য, স্থায়িত্ব না হওয়ায় ওইসব কাজে যে টাকা ব্যয় করা হয়েছে, সেগুলো অযথা। পরে বৃষ্টিতে ওইসব গাছের খুঁটির পাইলিং ও মাটি সরে সব ভেঙে গেছে। এরপরও আবার গাছে খুঁটি গেড়ে পাইলিং দিয়ে মেরামত করা হচ্ছে, রাস্তার ওইসব স্থান। ফলে একইভাবে কিছু দিনের মধ্যেই ভেঙে ধসে যাবে গাছের খুঁটির পাইলিং।



সংশ্লিষ্ট অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্তমানে রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়কটি যাতায়াত ও যান চলাচলে মোটেও নিরাপদ নয়। সড়কের দুই পাশে যে ৩১ স্থানে ভাঙন হয়েছে এবং বিভিন্ন জায়গায় বড় বড় গর্ত রয়ে গেছে, সেগুলো খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। এ ছাড়াও ওই পাহাড় ধসের ঘটনায় রাঙামাটি জেলার সঙ্গে সংযুক্ত সড়কের মধ্যে ১১৫ স্থানে ভাঙন ও গর্ত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়। এসব সড়কের মধ্যে রয়েছে রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি-কাপ্তাই-বান্দরবান সড়কসহ অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন সড়ক। এসব সড়কে গাছের খুঁটি দিয়ে করা পাইলিং ও মাটি ভরাট কাজ সরকারি দলের লোকজন ভাগাভাগি করে নিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এবারও একইভাবে দুই কোটি টাকার ১০ গ্রুপের পাইলিং কাজ ভাগ করে দেয়া হয়েছে, সরকারি দলের  ওই দুই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে।

রাঙামাটি বাস মালিক সমিতির নেতৃবৃন্দ  বলেন, এখানে কাজে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে বলে মনে হয়। রাঙামাটিতে যে কোনো উন্নয়ন কাজে সমন্বয় থাকলে দ্রুত যে কোনো সমস্যার সমাধান হতে পারত। এখানে যে যার যার ইচ্ছামফিক কাজ করছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড, পার্বত্য জেলা পরিষদ, সড়ক ও জনপথ বিভাগ, এলজিইডি, গণপূর্ত, এডিবিসহ বেশ কিছু সংস্থা রয়েছে। তারা সমন্বয় করে কাজ করলে এসব সমস্যার দ্রুত সমাধান সম্ভব হতো।


সাময়িক সড়ক সংস্কার নিয়ে রাঙামাটি জেলা প্রশাসক একেএম মামুনুর রশীদ বলেন, সড়কের দুই পাশে গাছের খুঁটি দিয়ে যেসব পাইলিং কাজ করা হয়েছে, এগুলো অযথা। বর্ষা আসার সঙ্গে সঙ্গে এসব গাছের খুঁটির পাইলিং ভেঙে যাবে। এগুলো কোনো কাজে আসবে না। তারপরও বর্ষায় সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল রাখতে ব্যবস্থা নিতে সড়ক জনপথ বিভাগ ও এলজিইডিকে বলা হয়েছে।

এসব বিষয়ে জানতে ফোনে যোগাযোগ করা হলে বিষয়টির সব দায়-দায়িত্ব এড়ানোর চেষ্টা করেন, রাঙামাটি সড়ক ও জনপথ বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী উৎপল সামন্ত। তিনি বলেন, এসব কাজ নিয়ে তার পক্ষে বিস্তারিত বলা সম্ভব নয়। কাজের সবকিছুর দায়িত্বে খাগড়াছড়ির নির্বাহী প্রকৌশলী। কাজেই যা বলার তিনি-ই বলবেন।



যোগাযোগ করা হলে রাঙামাটি সড়ক ও জনপথ বিভাগে অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা খাগড়াছড়ির নির্বাহী প্রকৌশলী শাকিল মো. ফয়সাল জানান, এবার বর্ষায় ভাঙন রোধে রাঙামাটি-চট্টগ্রাম প্রধান সড়কসহ জেলার বিভিন্ন সড়কে জরুরি ভিত্তিতে অস্থায়ী মেরামত কাজ চলছে। এসব কাজে ৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা বরাদ্দের ছাড় পাওয়া গেছে। এসব কাজের মধ্যে গাছের খুঁটি দিয়ে অস্থায়ী ভাঙন প্রতিরোধে ধারক পেলা সাইডিং বা পাইলিংয়ে প্রায় দুই কোটি টাকার কাজ হচ্ছে। কাজ দ্রুত শেষ করার চেষ্টা চলছে। কাজে কোনো রকম ত্রুটি বা অনিয়ম-দুর্নীতি হচ্ছে কিনা, তা নিয়ে নিশ্চিত নই। কারণ আমাকে রাঙামাটির অতিরিক্ত দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তাই কাজের তদারকি করছি মাত্র। তবে কাজ যাতে ভালোভাবে হয়, সেদিকটা লক্ষ্য রাখছি।

রাঙামাটি |  আরও খবর
এইমাত্র পাওয়া
আর্কাইভ
সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত, ২০১৭-২০১৮।    Design & developed by: Ribeng IT Solutions